ঐতিহাসিক ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে শহীদ জুলফিকার আহমেদ শাকিলসহ জুলাই আন্দোলনের সকল শহীদের স্মরণে নারায়ণগঞ্জে আয়োজিত ‘জুলাই শিখা’ কর্মসূচিতে জুলাই সনদ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত প্রচার সম্পাদক রাইসা ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ছাড়া শহীদদের স্বপ্ন পূরণ হবে না।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
রাইসা ইসলাম বলেন, জুলাই শুধু একটি মাসের নাম নয়; এটি প্রতিরোধের নাম, সাহসের নাম এবং জেগে ওঠার ইতিহাস। যখন অন্যায় সমাজকে গ্রাস করে, যখন মানুষের কণ্ঠরোধ করা হয় এবং মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তখনই মানুষ নিজের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে রাজপথে নেমে আসে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল সেই সংগ্রামেরই এক ঐতিহাসিক অধ্যায়।
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে—ভয়কে জয় করা যায়, দমন-পীড়ন কখনো চিরস্থায়ী হয় না এবং জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তির সামনে কোনো স্বৈরশাসন কিংবা ক্ষমতার দম্ভ টিকে থাকতে পারে না। অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধই ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি প্রসঙ্গে রাইসা ইসলাম বলেন, আজ ৪ আগস্ট, প্রতীকী ৩৫শে জুলাই। দুই বছর আগে এই সময় শিশু, কিশোর, শ্রমিক, ছাত্রসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল। সেই সময় দেশের মানুষের বিবেক নাড়া দিয়েছিল এবং এক দফা দাবির বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণমানুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশের পুনর্গঠন, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো বাকি। তাই সারাদেশের মুক্তিকামী জনগণের পক্ষ থেকে আমরা অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানাই।
শহীদ জুলফিকার আহমেদ শাকিলকে স্মরণ করে রাইসা ইসলাম বলেন, আজকের এই দিনে আমাদের সহযোদ্ধা জুলফিকার আহমেদ শাকিল মিরপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা মহানগরের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। আমরা তাঁর আত্মত্যাগ কখনো ভুলবো না।
তিনি আরও বলেন,শহীদ আবু সাইদ, মুগ্ধ, ওয়াসিমসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক হাজারেরও বেশি শহীদের আত্মত্যাগ আমাদের পথ দেখায়। তাঁদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়েই আমরা আজও আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে আছি। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র, সাম্য ও ন্যায়বিচারের দাবিতে সংগ্রাম চালিয়ে যাব।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে রাইসা ইসলাম বলেন, আমরা অতীতে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা দেখেছি, আবার বর্তমানেও রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ ও সহিংসতার ঘটনা দেখতে পাচ্ছি। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশে আর কোনো গুন্ডাতন্ত্র, সহিংসতা কিংবা প্রতিহিংসার রাজনীতি দেখতে চাই না। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তা কখনো সহিংসতায় রূপ নেওয়া উচিত নয়।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন,জুলাইয়ের শহীদদের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল—সাম্য, সমতা, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা—তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বস্তরের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিহিংসার রাজনীতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং গণতন্ত্রকামী মানুষের মনে ভয়ের পরিবেশের অবসান ঘটাতে হবে।
বক্তব্যের শেষাংশে রাইসা ইসলাম বলেন,জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হবে। মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র, বৈষম্যহীন সমাজ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ছাড়া শহীদদের স্বপ্ন পূরণ হবে না।
অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত নেতাকর্মী ও অংশগ্রহণকারীরা শহীদদের স্মরণে ‘জুলাই শিখা’ প্রজ্বালন করেন এবং তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।